"গল্পটি টরন্টোতে বেড়ে ওঠা এক প্রবাসী বাঙালি কিশোরের শেকড়ে ফেরার সংগ্রামের গল্প। তার জন্মের পরপরই পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর বন্ধন ছিল, এবং শৈশবের প্রথম কথাগুলোও ছিল বাংলায়। কিন্তু কানাডার পরিবেশে বড় হতে হতে স্কুল, বন্ধু-বান্ধব এবং কার্টুনের প্রভাবে ধীরে ধীরে তার জীবন থেকে বাংলা ভাষা হারিয়ে যেতে থাকে।
এক সময় নিজের ফিলিপিনো বন্ধুদের মাতৃভাষায় কথা বলতে দেখে এবং বাংলাদেশে গিয়ে নিজের ভাঙা ভাঙা বাংলার জন্য অন্যদের হাসি-ঠাট্টার পাত্র হয়ে সে নিজের ভুল বুঝতে পারে। এই উপলব্ধি থেকে সে জেদ ধরে নিজের ভাষা পুনরায় শেখার। ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ শেখার চেয়েও বাংলা বর্ণমালা শেখা তার জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল, কিন্তু বাবার সহায়তায় সে হার মানেনি। বর্তমানে সে বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখছে এবং তার স্বপ্ন একদিন সে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সাহিত্য পড়ার মাধ্যমে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে—সে তার মায়ের ভাষা জানে।"
টরন্টোর স্কারবরো জেনারেল হাসপাতালে আমার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন বাবার লং ডিস্টেন্স কল থেকে প্রায় তিনশ ডলারের মত বিল হয়। সেদিনের প্রতিটা ফোন গিয়েছিল বাংলাদেশে আমাদের খুব কাছের আত্মীয় স্বজনদের কাছে। আমার জন্মের মাস তিনেক আগে আমাদের পরিবার কানাডাতে আসে। এর পর আমি যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকি, আমার কানে আসা প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা ছিল বাঙলায়। মায়ের কোলে চড়ে তার আদরের “ আমার সোনা বাবু” অথবা বাবার কাঁধে চড়ে রাজকুমারের গল্প শুনতে শুনতে একসময়য় কখন যে টিভিতে কার্টুনের ভক্ত হয়ে গেলাম মনে পড়েনা। তার পরেও বাবা বলেন, আমার প্রথম বলা কথা গুলো ছিল বাঙলায়, প্রথমে আমার উচ্চারিত কথা ছিল দাদা, মা এবং তার পরে বাবা। আমি অবাক হই সেই প্রথম বলা কথা গুলো আজও আমার মুখে রয়ে গেছে, আমি এখনো বাবাকে বাবা আর মাকে মা বলি। তবে কার্টুন দেখতে দেখতে একদিন আরও শেখা অন্যান্য বাংলা কথা গুলো একসময়য় আমার মুখ থেকে হারিয়ে যায়।

এরপর আমি যখন স্কুলে যাই, আমার বন্ধুদের কথা, স্কুলের কারিকুলাম আর বাসায় টিভির ইংলিশ প্রোগ্রাম দেখতে দেখতে একমাত্র বাবা আর মা ছাড়া আমার কথা থেকে বাংলা অনেক দূরে সরে যায়। মা প্রায়ই বলতেন বাসায় বাংলা বলার জন্য। কিন্তু সে কথা শোনা হয়নি বলে আজ এক ধরনের দুঃখ বোধ আমার মধ্যে কাজ করে। ক্লাসে মাঝে মধ্যে আমার ফিলিপিনো বন্ধুদের নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় যখন নিজেদের ভাষায় কথা বলতে শুনি তখন মনে হয় আমার বোধহয় নিজের ভাষা ভাল করে না শেখাটা ঠিক হয়নি। সেবার আমি যখন দেশে যাই, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে সবার সাথে বাংলা বলার চেষ্টা করি। দেখলাম সবাই আমার আড়ালে কেমন মিটিমিটি হাসছে। কেউ কিছু না বললেও আমি বুঝতে পারলাম আমার মরিচা ধরা বাংলা সবার জন্য বিনোদনের একটা ব্যাপার হয়েছে।
দেশ থেকে সেবার ফেরার পথে কয়েকটা বাংলা বই কিনে নিয়ে আসি। কোত্থেকে শুরু করব বুঝিনি প্রথম। বাংলা বর্ণ শিক্ষা আমার জন্য বিশাল একটা চ্যালাঞ্জ ছিল । এখানে পাঠ্যক্রমে ইংরাজির সাথে ফ্রেঞ্চ থাকায়, ফ্রেঞ্চ নিয়ে আমার সমস্যা হয়নি । আবার দশম শ্রেণীতে ওঠার পর থেকে বিদেশী ভাষা হিসাবে স্প্যানিশ শিখতে হয়েছে। একটা সত্যি কথা বলি, ফ্রেঞ্চ বা স্পেনিশ পড়তে যতটা না শ্রম দিতে হয়েছে তার চেয়ে বাংলা বর্ণ শিখতে অনেক বেশী শ্রম দিতে হয়েছে। তারপরেও ছেড়ে দেইনি। ধীরে ধীরে বাংলা পড়াও আমার আয়ত্তে চলে আসছে। আজকের লেখাটা তারই একটা চেষ্টা। তবে পুরোটা যে নিজেই লিখেছি, সে দাবি করবোনা। বাবার কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছি। তবে আশা করছি একদিন আমার মাতৃ ভাষা বাংলা পুরোপুরি লিখতে শিখে যাব। বাবা খুব কবি রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের বই পড়ার কথা বলেন। একদিন নিশ্চয়ই তাদের লেখা পড়ব, আর সেদিন গর্ব করে বলতে পারব আমার মায়ের ভাষা আমি শুধু বলতেই পারিনা পড়তেও পারি।
ফারহান রহমান
দ্বাদশ শ্রেণী
Comments 0
No comments yet. Be the first to comment!
Sign in to leave a comment.